মাশরাফির একটি অনুরোধ

আমাদের ক্রিকেটাভ্যাসের মধ্যেই সম্ভবত লুকিয়ে থাকে ধারণাবন্দি হয়ে পড়ার প্রবণতা। আমরা কী কী আশা বা শঙ্কা করব তার একটা নীরব তালিকাও যেন প্রস্তুত হয়ে থাকে আমাদের অপেক্ষার মধ্যে! এই যেমন ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে পাকিস্তানের আম্পায়ার আলিম দার থাকবেন- এটা নিয়েই শঙ্কার মেঘে কালো ফেসবুকের দেয়াল।

ফেসবুককে নিজের মতো করে টকশোর টেবিল বানিয়ে এরই মধ্যে মতামত দেওয়াও শুরু হয়েছে। মাশরাফির হুঙ্কারের ছবির পাশে বাঘ আর কোহলির জিভ বের করার ছবিটির পাশে একটি প্রাণীর ছবি বসিয়ে ঘৃণার দেয়ালও আঁকা হচ্ছে সেখানে। লোকে মজা পাচ্ছে, লাইক দিচ্ছে, কেউবা ছাইচাপা বিদ্বেষের আগুনকে উসকেও দিচ্ছে। ভারত ম্যাচের আগে ফেসবুকের এই উত্তাপ না চাইলেও যে গায়ে লাগে, আর সেখানেই ভয় মাশরাফি বিন মুর্তজার। একটি ম্যাচকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ঘৃণার অন্ধ প্রলয় শুরু হয়, সেটা আদতে চাপ তৈরি করে টাইগারদেরই। সম্পর্ক নষ্ট করে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গেও।

মাশরাফি বলেন, ‘জানি ফেসবুকে এসব বন্ধ করা যাবে না। কিন্তু তার পরও অনুরোধ থাকবে, এই ম্যাচটির আগে যেন কোনো দলের ক্রিকেটারদের নিয়ে বাজে স্ট্যাটাস কিংবা ছবি বিকৃতি না করা হয়। এটা আদতে আমাদের ওপরই চাপ পড়ে। ম্যাচটি জিতে গেলে আমাদের নিয়ে আনন্দ-উল্লাস আর হেরে গেলে এই বিদ্বেষের শিকার হতে হয় আমাদেরই।’

ফেসবুকের দেয়াল থেকে ভারত ম্যাচের আগে কয়েকটি বিকৃত করা ছবি দেখে বিরক্ত হন টাইগার অধিনায়ক। অতীতে একবার ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচের আগে ধোনির কাটা মুণ্ডুর ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হলে সেটি নিজেই দেখেছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। দিল্লির এক সাংবাদিকের কাছে এরপর আক্ষেপ করেছিলেন বাংলাদেশি দর্শকদের সম্পর্কে তার ধারণা পরিবর্তন হওয়ায়। মুস্তাফিজের কাটার মাস্টার খেতাব দিয়ে বিরাট কোহলির ন্যাড়া মাথার ছবিও ভারতীয় মিডিয়ায় নেতিবাচকভাবে প্রচার করেছিল। তারপর থেকে বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমের সঙ্গে আগের মতো হৃদতার সম্পর্ক নেই ভারতীয় ড্রেসিংরুমের।

‘রোহিত শর্মার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক। একই স্পন্সরের ব্যাট আমরা ব্যবহার করতাম। মাঝে মাঝেই আগে কথা হতো। একবার ও বলেই ফেলে তোমাদের দেশের সমর্থকরা আমাদের বুঝি একেবারেই পছন্দ করে না।’ নাম লিখবেন না অনুরোধ করে বাংলাদেশ দলের ওই ক্রিকেটারেরও আক্ষেপ- ‘আজ আমাদের কাউকে কাউকে নিয়ে খুব উচ্ছ্বাস, কিন্তু জানি খারাপ সময় গেলে আজ যারা নাচছে তারাই বাজে মন্তব্য করবে। আসলে ফেসবুকে কাউকে আঘাত করে খুব আনন্দ পায় তারা।’

গেল বিশ্বকাপে মেলবোর্নে আম্পায়ারের সেই বিতর্কিত ‘নো’ বল নিয়েই আসলে দু’দেশের মধ্যে ‘ওয়ার অব ফেসবুক’ শুরু হয়। একে একে বাংলাদেশ-ভারত প্রতিটি ম্যাচের আগেই তা বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়। এটা শুধু এদিক থেকে নয়, সেদিক থেকেও হয়। ভারতের কিছু আঞ্চলিক টেলিভিশন চ্যানেলেই বাংলাদেশ দল নিয়ে বাজে সব মন্তব্য করা হয়। ফেসবুক কিছু গ্রুপেও ভারতীয়রা তীব্রভাবে আক্রমণ আনে, ব্যঙ্গ করে টাইগাদের নিয়ে।

‘ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো যখনই আমার সাক্ষাৎকার নিতে আসে, ততবারই আমি একই অনুরোধ করি। এটাও বলি যে, ফেসবুকে এই আগলি ওয়ার বন্ধ হওয়া উচিত। আমাদের দুদলের ক্রিকেটারদের মধ্যে একটা ভালো সম্পর্ক রয়েছে। শুধু ভারত নয়, অন্য দলগুলোর সঙ্গেও আমাদের সম্পর্কটা বেশ ভালো। দেখা হলেই আমরা সৌজন্য প্রদর্শন করি। মাঠে নামলে আমরা একে অন্যের প্রতিপক্ষ। আমরা দুদলই যে কোনো মূল্যে ম্যাচটি জিততে চাই। সেখানে কোনো ছাড় নেই।’

ফেসবুকের ঘৃণাভরা দেয়াল নয়, মাঠের ২২ গজকেই ভারত ম্যাচের জমে থাকা বারুদ জ্বালাতে চান মাশরাফি বিন মূর্তজা। নিজের শেষ বিশ্বকাপের এই ম্যাচটিকে বিভিন্ন কারণে স্মরণীয় করে রাখতে চান। কারণগুলো কী? সেটা পরে একসময় বলা যাবে। সূত্র: সমকাল

share this news:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *