চলতি বছরে বিচার শেষ হওয়ার আশা রাষ্ট্রপক্ষের

রাজধানীর গুলশানে স্প্যানিশ রেস্তোরাঁ হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার চলতি বছরেই শেষ হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জাহাঙ্গীর হোসেন চৌধুরী।

তিনি বলেছেন, মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আদালত প্রতি মাসে দুই থেকে তিনটি করে তারিখ ধার্য করেছেন। মামলায় ২১১ জন সাক্ষী থেকে এখন পর্যন্ত ৬০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে ২৫ জন পুলিশ সদস্য। আমরা আশা করছি চলতি বছরেই এই মামলার বিচার কাজ সম্পন্ন হবে।

ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমানের আদালতে মামলাটি বিচারধীন। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর জাহাঙ্গীর হোসেন চৌধুরী বলেন, এরই মধ্যে যেসব সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা আসামিদের দোষী প্রমাণ করা জন্য যথেষ্ট।

‘এছাড়া এ মামলার ছয়জন আসামি আদালতে বিভিন্ন সময়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা মতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানেও তারা হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তারপরও মামলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া এখনও বাকি রয়েছে। আমরা রাষ্ট্রপক্ষ আশা করছি, আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা দেবেন আদালত।’

অবশ্য ভিন্নমত ব্যক্ত করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদ। তিনি বলেন, এ মামলার কোনো সঠিক সাক্ষ্যপ্রমাণ এখন পর্যন্ত উপস্থাপন করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। কোনো সাক্ষীও আসামিদের নাম বলতে পারেননি।

‘মামলার এজাহারেও কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। আসামিরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত বা সহযোগী ছিল—সে বিষয়েও কোনো সাক্ষী কিছু বলতে পারেননি। এছাড়া মামলার আলামতের সঙ্গে কোনো কিছুরই মিল নেই। রায় হলে আসামিরা সবাই খালাস পাবেন।’

মামলার বিচার কার্যক্রম
গত বছরের ২৬ নভেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়। পরে ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর থেকে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।

এদিকে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি রাতে গাজীপুরের বোর্ডবাজার থেকে র্যাবের হাতে আটক হয় এ মামলার পলাতক আসামি মামুনুর রশিদ ওরফে রিপন।

আর শরিফুল ইসলাম ওরফে আব্দুস সবুর খানকে ২৫ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল থেকে গ্রেফতার করা হয়।
হলি আর্টিজান হামলা মামলার কার্যক্রম বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। মামলায় এ পর্যন্ত ৬০জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। সর্বশেষ গত ২৫ জুন পাঁচ পুলিশ সদস্য সাক্ষ্য দিয়েছেন। মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে ২ জুলাই।

সাক্ষ্য দিলেন যারা
মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন পুলিশ সুপার (এসপি) আব্দুল আহাদ, জসিম উদ্দিন, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এডিসি ওবায়দুল হক, পরিদর্শক মাহবুব আলম ও উপ-পরিদর্শক বিল্লাহ ভূঁইয়া।

সাক্ষ্য দিয়েছেন পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মাদ ইয়াসিন গাজী, নায়েক মো. লুৎফর রহমান, কনস্টেবল পলাশ মিয়া, কনস্টেবল মো. মাহফুজুর রহমান ও কনস্টেবল মো. খোরশেদ আলম, পরিদর্শক রফিকুল আলম, উপ-পরিদর্শক (এসআই) কবির হোসেন ও সহকারী উপ-পরিদর্শক মিজানুর রহমান, দিদার হোসেন ও দীন ইসলাম।

এছাড়া বনানী থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) ওয়াহিদুজ্জামান, ভাটারা থানার এসআই ফারুক হোসেন, একই থানার এএসআই সোহাগ হোসেন ও কনস্টেবল প্রদীপ চন্দ্র দাস।

হামলায় নিহত ও তৎকালীন বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিনের স্ত্রী রেনকিম, শরিফুল, আ. সবুর খান, নুরজাহান ও দাউদ সাক্ষ্য দিয়েছেন।

এছাড়া সাক্ষ্য দেন নিহত এসি রবিউল ইসলামের ছোট ভাই শামসুজ্জামান ও খালাতো ভাই আনোয়ার হোসেন এবং রেস্তোরাঁর ক্রেতা নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক হাসনাত রেজা করিমের স্ত্রী শারমিনা পারভীনও।

কী ঘটেছিল সেদিন
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় বন্দুকধারী জঙ্গিরা। এদিন তারা দেশি-বিদেশি মোট ২০ জনকে হত্যা করে।

নিহতদের মধ্যে জাপান, আর্জেন্টিনা, ইতালি ও ভারতের নাগরিক ছিলেন। হামলায় নগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন নিহত হন।

পরে রাতভর যৌথ বাহিনীর কমান্ডো অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্টে’ জঙ্গিদের সবাই নিহত হন। এ ঘটনার পর ওই বছরের ৪ জুলাই গুলশান থানার এসআই রিপন কুমার দাস বাদী হয়ে গুলশান থানায় একটি মামলা করেন।

আসামি কারা
২০১৮ সালের ২৩ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের পরিদর্শক হুমায়ূন কবির আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আসামিরা হলেন—হামলার মূল সমন্বয়ক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরীর সহযোগী আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আবু জাররা, ঘটনায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী নব্য জেএমবি নেতা হাদিসুর রহমান সাগর, নব্য জেএমবির অস্ত্র ও বিস্ফোরক শাখার প্রধান মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, জঙ্গি রাকিবুল হাসান রিগ্যান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব ওরফে রাজীব গান্ধী, হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী আব্দুস সবুর খান (হাসান) ওরফে সোহেল মাহফুজ, শরিফুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদ।

এছাড়া বিভিন্ন সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় গুলিতে নিহত হয় মাস্টারমাইন্ড তামিম আহমেদ চৌধুরী, জাহিদুল ইসলাম, তানভীর কাদেরী, নুরুল ইসলাম মারজান, আবু রায়হান তারেক, সারোয়ার জাহান, আব্দুল্লাহ মোতালেব, ফরিদুল ইসলাম আকাশ, বাশারুজ্জামান চকলেট ও ছোট মিজান।

বেওয়ারিশ পাঁচ জঙ্গিসহ সাত মরদেহ
পাঁচ জঙ্গিসহ শেফ সাইফুল ইসলাম ও সহকারী শেফ শাওনের মরদেহ দীর্ঘদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পড়ে ছিলো। কোনো দাবিদার না পাওয়ায় বেওয়ারিশ হিসেবে সেগুলো আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

share this news:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *