গল্প – “আমার আত্মাহুতির অভিযান”

গল্প – “আমার আত্মাহুতির অভিযান”

মোঃ শাহাদাত হোসেন রাজু

মধ্যবিত্ত শহরে নিঝুম রাত্রিবেলা আপন গৃহের মেঝেতে বসে নিভু নিভু আলোতে ছেলেটি কী যেন লিখতে ছিল আর বারবার ছোট্ট একটি শিশির দিকে তাকিয়ে এক টুকরো কাপড় দিয়ে চোখের জল মুছতে লাগল। আরেকটু কাছে গিয়ে তার অশ্রুভেজা ডায়েরির পাতায় তাকিয়ে দেখি, এই কী! সে তো পৃথিবীর সান্নিধ্যে নতুন করে আরও একটি আমাকে রচনা করতে যাচ্ছে। আমিও তার কলমের কালিতে লেখা প্রতিটি শব্দে আমাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম। আমার মতো

জীবনের প্রতি তীব্র অনীহা থেকেই ছেলেটি লিখছিল…..

হে প্রিয় বাবা-মা!

আমি জানি, তোমাদের চোখেমুখে এখন সন্তান হারানো বেদনার লোনাজল ভেসে উঠছে বারবার।বারবার কাঁদো মুখে চিৎকার দিয়ে হয়তো বলতেছো বাবা! কি করে পারলি তুই! এভাবে আমাদের ছেড়ে যেতে? বল বাবা! বল! কী অপরাধ ছিল আমাদের? তোমাদের কোনো অপরাধ ছিল না। আমার কাছে আমিই বড্ড অপরাধী ছিলাম। বড় হওয়ার পর থেকে আদৌও পর্যন্ত তোমাদের একমুঠো পরিমাণও সুখের কারণ হতে পারেনি। প্রবল ইচ্ছে নিয়ে শৈশব থেকে বেড়ে উঠেছি আমি। কিন্তু জানিনে বিধাতা কেন আমার সাথে অপূর্ণতাকে জড়িয়ে দিয়েছে। তবুও বিধাতার উপর ভরসা রেখে এগুচ্ছিলাম ঠিকই কিন্তু কেন জানি মনে হলো তোমরা সবাই দিনদিন আমার উপর বিষন্ন হয়ে উঠছো। তোমাদের এই বিষন্নতা আমাকে একটি জীবন্ত লাশে পরিনত করেছে বিধায়ই আজ তোমাদের বিষন্নতাকে বিদায় দিলাম। আমি জানি, আমার উপর আজ পাড়াপড়শি এবং আত্মীয়স্বজন সবার ভীষণ মায়া হচ্ছে।জানো, এইটা না একটি মিথ্যে মায়া কেবল কারণ বেঁচে থাকতে ওরা সবাই আমাকে অকেজো বলে হাসিঠাট্টা করতো।জানো, আমি একজন শিক্ষিত ছেলে কিন্তু কোথাও আমার অর্জিত শিক্ষাটুকুর সামান্য পরিমাণও সম্মান ছিল না। হে প্রিয় জন্মদাতা বাবা-মা, তোমাদের কাছে আমার বিশেষ অনুরোধ থাকবে আমাকে পোস্টমর্টেম করতে দিও না। কারণ পৃথিবীতে সামান্য চিমটিতেও আমি ভীষণ কষ্ট পেতাম।যার ভয়ে কখনো কারো সাথে উচ্চস্বরে কথা বলার সাহস পায়নি। তোমরা আমার এই নিথর দেহকে সাধারন মৃত্যু ভেবে দাফন করে দিও। ভালো থেকো তোমরা। আর হ্যাঁ আমার ছোট্ট বোনটিকে দেখে রেখো।

ইতি,

তোমাদেরই অকেজো ছেলে।

লেখাটি শেষ করে ছেলেটি ঐ ছোট্ট শিশিটি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছে আর মুখের ভিতর কী যেন পড়তে লাগল। হয়তো ধর্মীয় পাঁচ কালেমা পড়েছিল। ছেলেটির এই শেষ জীবন্ত দশায় আমার খুব মায়া হচ্ছিল বিধায়ই তার সামনে আমি দৃশ্যমান হয়ে উঠি এবং তাকে বাকরূদ্ধ করে ঐ ছোট্ট শিশির মুখটি খুলে ভিতরের বিষাক্ত জল আমি গিলে ফেলি।এবং আমার এই মৃত্যু যন্ত্রণার দৃশ্য দেখে ছেলেটি কাঁদো কণ্ঠে চিৎকার দিয়ে উঠে।তৎক্ষনাৎ পাশের বাসা থেকে কারা যেন বিরক্তিকর কণ্ঠে বলছিল এই অকেজো ছেলেটার কারণে দিনেও শান্তি নাই, রাতেও শান্তি নাই।ততক্ষণে আমিও অদৃশ্য হয়ে গেলাম।ছেলেটিও ডায়েরির ঐ ভেজা পাতাটি বেয়ে বিষের শিশিটি জানালার বাইরে ছুড়ে ফেলে দেয়।

share this news:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *