এই শতকের সবচেয়ে বড় সুখবর কি তাহলে দ্রুতই পেতে যাচ্ছি?

সম্প্রতি এরই মধ্যে অন্তত ডজনখানেক ওষুধ যেমন ফ্যাভিপিরাভির, রেমডেসিভির, ইন্টারফেরন আলফা টুবি, রিবাভিরিন, ক্লোরোনকুইনিন, লোপিনাভির এবং আরবিডল কভিড-১৯ চিকিৎসার সারিতে জমা হয়েছে। সরাসরি নভেল করোনাভাইরাসের জন্য তৈরি না হলেও অন্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করা ড্রাগ করোনাভাইরাস ঠেকাতে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার শুরু হয়েছে।

করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় ট্যাবলেট এভিগান (জেনেরিক নাম- ফ্যাভিপিরাভির) আবিষ্কার করেছে জাপানের ফুজি ফিল্ম কোম্পানির সাবসিডিয়ারি ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান তয়োমা কেমিক্যাল কোম্পানি।‌ ঔষধটি এখন বাংলাদেশের বেক্সিমকো ও বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস ও তৈরি করছে

ফ্যাভিপিরাভির

ইতিমধ্যে ঔষধটি বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসনে হস্তান্তর করেছে ঔষধটি সরকারকে সরবরাহ করার পাশাপাশি যে সমস্ত হাসপাতালে করোনা রোগী আছে সেখানেও সরবরাহ করা হবে। তবে এখন‌ই ফার্মেসিতে সরবরাহ করা হবে না।

ম্যাটেরিয়াল স্বল্পতার কারণে এখন মাত্র ১০০ রোগীর জন্য ঔষধটি তৈরি হবে, তবে এ মাসের মধ্যেই ঔষধটি উৎপাদন বাড়াতে পারবে বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস যে সমস্ত হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি আছে সেখানে ঔষধটি পৌঁছে দেবে। প্রতিটি ট্যাবলেটের দাম ৪০০ টাকা হলেও এখন এটি বিনামূল্যে আক্রান্ত রোগীদের সরবরাহ করা হবে।

 Source: NHK Japan 

ঔষধটি প্রস্তুতের পেটেন্ট জাপানের হলেও অনুন্নত দেশ হিসেবে তারা বাংলাদেশকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ঔষধটি প্রস্তুতের অনুমোদন দিয়েছে।

ফ্যাভিপিরাভির ঔষধটি কভিভ১৯ রোগের সুনিশ্চিত চিকিৎসা নয়, তবে ১২০ জন রোগীর উপরে পরীক্ষা করে সাফল্য পাওয়া গেছে। আক্রান্ত তরুণ রোগীদের উপরে ওষুধটি ব্যবহার করে ৭ দিনে এবং বয়স্কদের উপরে ব্যবহার করে ৯ দিনে কভিভ১৯ নেগেটিভ হয়েছে। ফ্যাভিপিরাভির ঔষধটির সাথে ওরভেসকো নামক আরও একটি ঔষধ মিলিয়ে ট্রায়ালগুলো করা হয়েছে।

জাপান, তুরস্ক এবং চায়না ওষুধটি ব্যবহার করছে। কভিভ১৯ রোগে আক্রান্তের তিনটি পর্যায়- সাধারণ, মাঝারি ও মারাত্মক। এই তিন ক্ষেত্রেই ঔষধটি কার্যকর। গর্ভস্থ শিশুর উপরে ওষুধটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে।

আমেরিকার খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন এখনও কভিভ১৯ রোগের চিকিৎসার জন্য কোনো ঔষধকে অনুমোদন দেয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য দপ্তর এবং অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য দপ্তর ফ্যাভিপিরাভির ঔষধটিকে এখনও অনুমোদন দেয়নি। বর্তমানে বিশ্বের ২০টি দেশে ওষুধটির ট্রায়াল চলছে।

আর সাইড এফেক্ট যেটা বলা হচ্ছে অবশ্যই অনেক গুরুত্বপূর্ন সেটা প্রেগনেন্ট মহিলাদের জন্য। আর আমরা হর হামেশা মুড়ির ন্যায় যে নাপা, গ্যাস্টিকের ওষুধ খাই তাতেও রয়েছে অনেক সাইড ইফেক্ট। তাই যেখানে জীবন বাঁচনো মূল লক্ষ্য সেখানে সাইড ইফেক্টকে কিছুটা পাশে সরিয়ে রাখছে বিশেষজ্ঞরা।

আমেরিকার খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন এখনও কোভিভ-১৯ রোগের চিকিৎসার জন্য কোনো ঔষধকে অনুমোদন দেয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য দপ্তর এবং অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য দপ্তর ফ্যাভিপিরাভির ওষুধটিকে এখনও অনুমোদন দেয়নি। ইতালিতে ট্রায়ালে ভালো ফল পাওয়া গেছে তবে সরকারিভাবে এখনও অনুমোদন দেয়নি। বর্তমানে বিশ্বের ২০টি দেশে ওষুধটির ট্রায়াল চলছে।

বিশ্বজুড়ে কভিড-১৯ চিকিৎসায় আরো দুটি ওষুধ নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। একটি এন্টিভাইরাল ওষুধ ‘রেমডেসিভির’ অন্যটি ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রথম ওষুধটিতে আশার আলো তৈরী হলেও দ্বিতীয় ওষুধটিতে মারাত্বক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে।

রেমডেসিভির : বায়োটেক কম্পানি গিলিয়েড সায়েন্সেস গত শুক্রবার একটি বিশ্লেষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে। এতে বলা হয়, কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মারাত্বক অসুস্থ হওয়া ৫৩ রোগীর ওপর রেমডেসিভির ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এতে ৫৩ রোগীর মধ্যে ৩৬ জনের অবস্থার উন্নতি হয়, ৮ জনের অবস্থার অবনতি হয় এবং ৭ জন মারা যান। বিশেষকরে ভেন্টিলেটর বা লাইফসাপোর্টে থাকা ৩০ জন রোগীর মধ্যে ১৭ জনকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। গবেষক বলছেন, এ ওষুধ প্রয়োগকৃত সিরিয়াস রোগীর মৃত্যুর হার দেখা গেছে ১৩ শতাংশ। যা চীনে মৃত্যুর হার ১৭-৭৮ শতাংশ এর কম।

এ গবেষণাটিতে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এটি সঠিকভাবে প্রমাণিত নয়। তবুও এ গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন রেমডেসিভির নিয়ে আশার আলো পাওয়া গেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ ও জাপানেও এ ওষুধের ব্যবহার সিমীত আকারে হয়েছে, যা থেকে ভালো ফল পাওয়া গেছে।

এ বিশ্লেষণের মূল গবেষক সেডার্স-সিনাই মেডিক্যাল সেন্টার ইন লস অ্যাঞ্জেলস এর হসপিটাল এপিডেমিওলোজির পরিচালক জনাথন গ্রিয়েন বলেন, ‘আমরা চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসছি না এ ডাটা থেকে। তবে আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে এ ওষুধ প্রয়োগ করে আশার আলো পাওয়া গেছে।’

এ বিষয়ে বার্মিংহামে ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞ পল গয়েপফার্ট ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত এটি একটি সম্ভাবনাময় ওষুধ, যদিও কার্যকরভাবে এখনো প্রমাণিত হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘এটি থেকে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হচ্ছে এ ওষুধ কিন্তু কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরী করে না।’

হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন : ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রোক্সিকোরোকুইন নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ফ্রান্স। দেশটির ওষুধ নিরাপত্তা সংস্থা এএনএসএম প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনকে কভিড-১৯ চিকিৎসায় সম্ভাব্য মিরাকল ভাবা হলেও এটি হার্টের রোগীদের ক্ষেত্রে মারাত্বক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরী করে। তাই মেডিক্যাল ডাক্তারের তত্ত্বাবধান ছাড়া এটি ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিবেদনে বলা হয়, রোগীর হৃদযন্ত্রে সমস্যা হচ্ছে এমন ৪৩টি ঘটনায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন এর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক গবেষণা বলছে, হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন বিশেষত কার্ডিওভাসকুলারের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরী করে। কভিড-১৯ এর রোগীদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরো বেশি। তাই এ ওষুধ ব্যবহার করা হলেও তা অবশ্যই হাসপাতালে ব্যবহার করতে হবে ডাক্তারদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে।প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন বলছেন এটি কভিড-১৯ এর জন্য সম্ভাব্য চিকিৎসা তখন এর পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই যে এটি কভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে কাজ করে বা এটি ব্যবহার নিরাপদ। তাই চিকিৎসা বিজ্ঞনীরা এটিকে কার্যকর ওষুধ হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তারা বলছেন, কিনিক্যাললি এটা এখনো প্রমাণিত নয় যে এটি কভিড-১৯ এর চিকিৎসায় কাজ করে।

কভিড-১৯ এ আক্রান্ত যারা একেবারে শেষ পর্যায়ে তাদের জন্য হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন শেষ অবলম্বন আখ্যা দিয়ে কাইজের ফ্যামিলি ফাউন্ডেশনের বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতি বিষয়ক সহকারী পরিচালক জশোয়া মিখাউদ বলেন, ‘এ ওষুধ বিপুল সংখ্যক মানুষ নেয়ায় আমি উদ্বিগ্ন। করোনার লক্ষণ বেশি বা কম হোক সবাই এ ওষুধ নিচ্ছে। অথচ এ ওষুধটি কভিড-১৯ চিকিৎসায় কার্যকর প্রমাণিত নয়, বিপরীতে এর মারাত্বক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে।’

এর কোন একটি ওষুধ যদি সত্যি করোনাভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারে, তাহলে এটিই হবে এই শতকের সবচেয়ে বড় অর্জন।

লেখক: জুবায়ের বিন লিয়াকত, ফেলো – আই ই বি    

তথ্য সূত্র: ব্লুমবার্গ, ভক্স ও NHK TV জাপান

share this news:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *