ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে!

রূপক সিংহ

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর অবস্থাটা এমন –

শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি লাভ করতে পারে না। শিক্ষার আলোয় আলোকিত ব্যক্তি এবং জাতি সবসময় উন্নতি ও অগ্রগতির শীর্ষে অবস্থান করে। দুঃখ জনক হলেও সত্য আমাদের দেশে শিক্ষার নামে চলে বাণিজ্যের মহোৎসব। অনেকটা ‘গুটে পুড়ে গোবর হাসে’ এমন অবস্থার মতো। অভিভাবক কাঁদছে স্কুল কতৃপক্ষ হাসছে। স্কুলের অস্তিত তৈরি হয়েছে অভিভাবক থেকে সেটাই স্কুল ভুলে গেছে!

‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা, সব শিশুদের অন্তরে’ আজকের শিশুরাই অনাগত দিনের ভবিষ্যত। জোর দিয়ে বলছি আমার সন্তানের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন ব্যাহত না হয়! শিক্ষা আমার সন্তানের অধিকার, এ অধিকার সবার চাই। প্রিয় সন্তানের আজকে নির্মল বাতাসে মুক্ত বিহঙ্গের মতো মুক্ত থাকার কথা ছিল, সবুজ ঘাসের সাথে একাকার হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সমুদ্র সৈকতে উল্লাস করার কথা ছিল। সবুজ ঘাস, নির্মল বাতাসতো দূরের কথা আজ পৃথিবীব্যাপী করোনার বিষাক্ত ছোবল সব কিছু লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। মানুষ হয়েছে ঘরবন্দি, অর্থনৈতিক ভাবে দিশাহারা এবং বিপর্যস্ত। পিতার আয়ের সল্পতার কারণে যে সন্তানটি আজকে মুখ লুকিয়ে রেখেছে লজ্জায়। বন্ধুদের সাথে প্রাণ খুলে কথা বলতে পারে না, মায়ের সাথে হাসি মুখে লুকোচুরি খেলতে পারেনা, সেতো আগামী দিনে সঠিক ভাবে বেড়ে ওঠার জন্য বাঁধা পেয়ে গেল। কি তার অপরাধ! তার তো নেই কোন অপরাধ, তা হলে আমার সন্তানকে কেন এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে? কেন তাকে ভাবতে হবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও আমার স্কুলের বেতন পরিশোধ করার জন্য জীবন বাজি রেখে কর্মস্থলে যেতে হয় আমার বাবা মাকে। সেতো হেরে যাবে তার নিরপরাধ শিশু মনের কাছে। তার বিকাশ উন্মুখ মেধা বিকশিত হওয়ার পথে অন্তরায় ঘটবে। এমনতো হওয়ার কথা ছিল না!

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১৫৯টি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের নিবন্ধন রয়েছে এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৪ হাজার ৫০৭ জন। তবে বাংলাদেশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল অ্যাসোসিয়েশনের হিসেবে সারা দেশে এ ধরনের স্কুলের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশ। আর শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে জুলাই মাস থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়। সেই সাথে শুরু হয়ে যায় বেতন বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন রকমের ফন্দিফিকিরে বেতন বাড়ানো নিয়ে অভিভাবকদের হাজারো অভিযোগ থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু এই মহামারীতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর ব্যবহার আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আশার খবর করোনার গত কয়েক মাসে (এপ্রিল-মে-জুন) মাসে দেশের বেশিরভাগ স্কুল শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস নিয়েছে এবং পরীক্ষাও সম্পন্ন করেছে। সেই সাথে স্কুলের বেতন অর্ধেক করে নিলেও জুলাই মাস (নতুন শিক্ষাবর্ষ) থেকে তারা সেই আগের রূপ ধারণ করেছে। শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন পুরো আদায়ের জন্য অভিভাবকদের চাপ দেওয়া শুরু করেছেন।

যেকোনো বিদ্যালয় বিদ্যার্জনের অতি উত্তম রূপকার। সেই বিদ্যা মন্দিরে বিদ্যার সাথে সম্পৃক্ত যেকোনো ধরনের ব্যয় ছাত্রছাত্রীদের মাসিক বেতনের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় সেটা যদি হয় বেসরকারি বিদ্যালয় বা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আমি এখানে বেসরকারি বিদ্যালয়ের কথা বলছি কারণ, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়-দায়িত্ব অনেক অংশেই সরকার বহন করে থাকেন। এক্ষেত্রে অভিভাবক মহল একটা স্থির সিদ্ধান্তে থাকতে পারেন। বই কিনে কেহ দেউলিয়া হয় না (সৈয়দ মুজতবা আলী), বই পড়ে কেহ পথ হারায় না (আলেকজান্ডার)। আর বিদ্যালয়ে বা গুরু দক্ষিনা না দিলে সে পড়া বা শিক্ষা আলোর পথে বিকশিত হয় না (রবীন্দ্রনাথঠাকুর)। জীবনের চলার পথে সবকিছুই যথার্থ হওয়া বাঞ্ছনীয় (শেকসপিয়র)।

এইসব বেসরকারি বিদ্যালয়ের বেশি সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর অভিভাবক যারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন অথবা ব্যবসা করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছেন । যেটা এই মহামারি কালীন সময়ে একদম মুখ থুবড়ে পড়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের কম বেশি সমস্যা নেই বললেও ভুল হবে তাদেরও সমস্যা আছে। এখানে আমরা একটা কথা জোর দিয়ে বলতে পারি যে স্কুল খোলা থাকলে যে পরিমাণ ব্যয়ভার কর্তৃপক্ষের বহন করতে হয় বন্ধ থাকলে সেই পরিমাণ ব্যয়ভার লাগে না।  তাই চলতি জুলাই মাসেও ৫০% বেতন আদায় করলে সকলের জন্য মঙ্গল।

বর্তমান সরকার শিক্ষাবান্ধব সরকার। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের কাজগুলো দৃশ্যমান। কিন্তু এখন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর ব্যবহার, কর্মকান্ড শিক্ষাবান্ধব না হয়ে ব্যবসাবান্ধব হয়ে যাচ্ছে। যা অভিভাবকসহ সকলের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ শিক্ষা ক্ষেত্রে যারা কাজ করেছেন তাদের প্রতিও আহ্বান থাকবে শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ দেশের স্বার্থে জনগণের স্বার্থে এই বিষয়গুলোর ওপর নজর দেওয়া উচিৎ। শিক্ষা বাঁচলে উন্নত হবে দেশ, দেশ উন্নত হলে গর্বিত জাতী হিসেবে বিশ্ব ধরবারে উঁচু হয়ে দাঁড়াতে পারবো আমরা।

লেখক: সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও রিড অ্যালাউড বিডির প্রতিষ্ঠাতা।

share this news:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *