‘হুনছি সরকার গরিবদের ঘর কইরা দেয়, আমরা পামু কবে’

অভাবের কারণে পড়াশোনা করতে পারেননি উম্মে কুলসুম (৩২)। বিয়ে হয়েছে প্রায় ১৬ বছর আগে। তখন থেকেই স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন ময়মনসিংহের থানাঘাট বেড়িবাঁধে। স্বামী রমজান মিয়া (৩৫) দিনমজুরের কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলেন। অভাবের সংসারে কাজ করতে করতে কখন যে শরীরে রোগ বাসা বেঁধেছে তা নিজেও জানেন না। দুই বছর আগে শরীর যখন আর চলে না, তখন ডাক্তারের কাছে যান। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর স্বামী রমজানের কিডনিতে সমস্যা ধরা পড়ে।

কুলসুম-রমজানের সংসারে কাওছার ও কাইয়ুম নামে দুই সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে ময়মনসিংহ উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে আর ছোট ছেলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। দুই ছেলেকে নিয়েই তাদের যত স্বপ্ন। কিন্তু এমন অবস্থায় ছেলেদের পড়াশোনা কারানো দুঃসাধ্য। একদিকে ঠিকমতো তারা খেতে পারেন না, অন্যদিকে যাও একটি পর্দা টাঙানো ঝুপড়ি ঘর আছে সেটি দেখলে কেউ ঘর বলবে না। যে কোনো সময় বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যাবে, নতুবা মাথার ওপর ভেঙে পড়বে।

কথা হয় থানাঘাট বেড়িবাঁধে বসবাস করা উম্মে কুলসুমের সঙ্গে। তিনি  বলেন, ‘আমাগো কোনো ঘরবাড়ি নাই। তাইতো জীবনডা বাঁচাইবার লাইগা বেড়িবাঁধেই থাহি। তবে শান্তিতে ঘুমাইবার পারি না। মেঘ আইলে বুকের ওপর মেঘের পানি পড়ে। কয়েকদিন পর পর সরকারি লোক আইয়া সব ভাইঙ্গা দেয়। যামু কই, থাকুম কই, তাই তারা চইলা গেলে আবার ঝুপড়ি ঘর বাঁইধা কোনো রহম থাহি। আমাগোরে সরাইবার আগে থাহার জায়গা কইরা দেওন দরহার। নাইলে থাকুম কই। হুনছি সরকার গরিবদের থাহার লাইগা ঘর কইরা দেয়, আমরা পামু কবে।

কুলসুমের শাশুড়ি রহিমা খাতুন (৫৫) বলেন, আমার ছেলে রমজানকে কোলে নিয়ে এই বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তখন থেকেই এখানেই থাকি। কয়েকমাস আগেও সরকারি জায়গা উদ্ধারের জন্য সব ভেঙে দেয়া হয়। তখন আশ্বাস দেয়া হয়েছিল আমাদের তালিকা করে সরকারিভাবে ঘর করে দেয়া হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত পাইনি। কবে পাব তাও জানি না।

বেড়িবাঁধ বস্তির কয়েকজন বলেন, ঝুপড়ি ঘরে অনেক ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হয়। মাঝে মাঝে ঘরে সাপ-বিচ্চু ঢুকে পড়ে। ইতোমধ্যে বেড়িবাঁধের অনেককে ময়মনসিংহের বেগুনবাড়িতে সরকারিভাবে থাকার জন্য ঘর তৈরি করে দেয়া হয়েছে। ৬০ টি পরিবার কষ্ট নিয়ে এখানে বসবাস করছে। যারা এখনও ঘর পাইনি তারা কীভাবে রাত কাটাচ্ছে কেউ খবর নেয় না। সবাইকে সরকারিভাবে ঘর তৈরি করে দেয়ার দাবি জানান তারা।

কুলসুমের স্বামী রমজান মিয়া  বলেন, সরকারি একটি ঘরের আশায় হন্যে হয়ে ঘুরেছি বিভিন্ন অফিসে। তবে আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই পাইনি। আমি এখন খুব অসুস্থ। কামাই রোজগার বন্ধ। ঘরটা ভাইঙ্গা পড়তাছে। নিজের কোনো জায়গা নাই। এদিকে ছোট দুইটা ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এই মুহূর্তে সরকারিভাবে ছোট একটা ঘর পাইলে শান্তিতে ঘুমাইবার পারতাম। সরকার দিতাছে ঠিকই তবে আমরা পাইতাছি না। গরিব হইয়া জন্ম নিয়া কি অপরাধ করছি।

সংস্কৃতি কর্মী বাবলী আকন্দ বলেন, সদর উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ হাফিজুর রহমানের বদলির সময় মানবিক কারণে অসহায় উম্মে কুলসুমের জন্য একটি ঘরের কথা বলেছিলাম। তখন তিনি এসিল্যান্ড সাজ্জাদুল হাসানকে বিষয়টি দেখতে বলেন। পরে এসিল্যান্ড সাজ্জাদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি তার অফিস সহকারী রোকেয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। অফিস সহকারী রোকেয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাইনি।

এ নিয়ে তিনি নিজের ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। তিনি লেখেন- ‘সরকারি একটি ঘর বরাদ্দ পাবে কি কুলসুম!’ এতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সচেতন মানুষরা ময়মনসিংহের গুচ্ছ গ্রামের সরকারি জায়গায় অসহায় কুলসুমকে একটি থাকার ঘর করে দেয়ার দাবি জানান।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম  বলেন, ইতোমধ্যে ২৪০ জনকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ব্রক্ষপুত্র নদের পাড়ে যেই খাস জায়গা আছে সেখানে এর আগে যাদের তালিকা করা হয়েছে তাদেরকে অবশ্যই ঘর করে দেয়া হবে।

share this news:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *